
করোনায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় যখন পরিবারের অন্য সবার রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে কিন্তু বার বার আমার রিপোর্ট পজিটিভ আসছিলো, সে সময়টা আমার সবচেয়ে কঠিন সময় গেছে। একটা পর্যায়ে এসে মনে হয়েছিলো হয়তো এই যাত্রাই হয়তো আমার শেষ যাত্রা।কথাগুলো বলছিলেন দীর্ঘ ১ মাস চার দিন করোনার সাথে সংগ্রাম করে করোনা যুদ্ধে জয়ী হওয়া বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি ন্যাশনাল কাউন্সিলের সদস্য ও জেলা ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি ডা: শাহনেওয়াজ চৌধুরী।
গত ১২ই এপ্রিল স্ত্রী, মেয়ে ডা: ইসক্লেরা শাহনেওয়াজ, জামাতা ডা: তাজুল ইসলাম মুন্নাসহ করোনায় আক্রান্ত হন তিনি। তারা সবাই ঢাকার কুয়েত-মৈত্রী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। এ সময় তার একমাত্র পুত্র আহনাফ শাহরিয়ার ফাহিমও সাসপেক্টেড কেস হিসাবে তাদের সাথে চিকিৎসা নিয়েছে। চিকিৎসা শেষে ২রা মে ডা: শাহনেওয়াজ ছাড়া বাকী সকলের করোনা রিপোর্ট নেগেটিভ আসে। কিন্তু তার করোনা রিপোর্ট পুনরায় পজিটিভ আসে।
আরো ১৪ দিন পর ১৬ মে অবশেষে করোনার নেগেটিভ আসে তার। মধ্যবর্তী এই দিনগুলোতে কিভাবে দিন কাটিয়েছেন এবং কিভাবে করোনা যুদ্ধে জয়ী হয়েছেন সে বিষয়ে প্রাইম নারায়ণগঞ্জের সাথে নিজের অনুভুতি শেয়ার করেন নারায়ণগঞ্জ বেসরকারী ক্লিনিক মালিক সমিতির এ সভাপতি।
তিনি বলেন, করোনা যখন প্রথম দিকে আঘাত হানলো বাংলাদেশে। ঠিক সে সময়ই আমরা করোনায় আক্রান্ত হয়ে পড়ি। আমাদের ক্লিনিকে যেসব রোগীরা ভর্তি হতেন তাদের মধ্যে কেউ হয়তো কোভিড পজিটিভ ছিলেন। তার সংস্পর্শে আমাদের ষ্টাফ এবং আমরা সংক্রমিত হয়ে পড়ি। প্রথমে আমাদের একজন ষ্টাফের শরীরে উপসর্গ দেখা দেয়, তার পরীক্ষা করার পর রিপোর্ট আসলো পজিটিভ। তারপরই আমরা আমাদের সকল ষ্টাফ ও আমার পরিবারের সকলের কোভিড টেষ্ট করালাম। তখন দেখা গেলো আমাদের পরিবারের পাঁচজনের মধ্যে চারজন তথা আমি, আমার স্ত্রী, মেয়ে ও জামাতা করোনায় আক্রান্ত। এছাড়া আমার ক্লিনিকের ১৩ জন ষ্টাফ করোনায় আক্রান্ত হয়েছিল। আমি সাথে সাথেই জেলা প্রশাসক, জেলা পুলিশ সুপার, জেলা সিভিল সার্জনকে বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত করে আমাদের ক্লিনিক শাট-ডাউন করে দিলাম। একই সাথে আমরা ঢাকার কুয়েত-মৈত্রী হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছি।
অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, এ সময়ে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো মানসিক সমস্যা। এ সময়ে যেটা হয় মানুষের সেটা হলো একটা বন্দী জীবন, রুম থেকে বের হওয়া যায় না। অনেকটা জেলখানার মতো একটা অভিজ্ঞতা হয়। বাইরে কারো সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই, কোনো দেখা করা যায় না। ইভেন বাসার থেকে যে খাবারটা নিবো সেই সুযোগও আমাদের ছিলো না। পরবর্তী পর্যায়ে ১৪ দিন পর আবার পরীক্ষা করা হলো, পরীক্ষায় ৩ জনের করোনা নেগেটিভ আসলো। আমার করোনা পজিটিভ আসলো। এরপর পরপর দুই দিন দুই জায়গায় করোনা টেষ্ট করা হলো, একটি কুর্মিটোলায় এবং আরেকটি আইইডিসিআরে। এ দুই জায়গায় মধ্যে এক জায়গার রিপোর্ট আসলো নেগেটিভ, এক জায়গায় আসলো পজিটিভ। যেহেতু পজিটিভ এসেছে তাই আমি আবার ডেঞ্জার জোনেই রয়ে গেলাম। ঠিক সে সময়টায় মনের দিক থেকে আমি ভেঙ্গে পড়েছিলাম, আমি হতাশ হচ্ছিলাম এই ভেবে যে, আমার হয়তো আর করোনা নেগেটিভ রিপোর্ট আসবে না, পজিটিভই থাকবে। ভেবেছিলাম এই যাত্রাই হয়তো আমার শেষ যাত্রা।
কিন্তু আল্লাহর রহমতে আমি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলাম, শারীরিকভাবে আমি সক্ষমতা অর্জন করলাম এবং পরবর্তী পর্যায়ে পজিটিভ নেগেটিভ খেলার মধ্যে পড়ে গেলাম এবং শেষ পর্যন্ত নেগেটিভ রিপোর্ট আসলো। আল্লাহপাক আমাকে রহমত করলো তাই আল্লাহর দরবারে লাখ লাখ শুকরিয়া।
তিনি বলেন, যদিও আমি নিজেই নিরাশ হয়েছিলাম তারপরও সাধারণ মানুষের জন্য আমার ম্যাসেজ থাকবে নিরাশ হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু যখনই খারাপ লাগবে তখনই চিন্তা করতে হবে আল্লাহ পাক তো আমাকে নিয়ে যেতে পারতেন, আমাকে না নিয়ে তো চিন্তা করার জন্য আমাকে রেখেছেন। সুতরাং আমাকে চেষ্টা করে আবার ঘুরে দাড়াতে হবে।
তিনি মিডিয়ার প্রতি কৃতঞ্জতা প্রকাশ করে বলেন, স্পেশালি থ্যাঙ্কস ফুল টু আওয়ার মিডিয়া। তারা আমার জন্য গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ করেছিলো যে আমি স্বপরিবারে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি এবং সবার কাছে দোয়া চেয়েছি। মিডিয়ার মাধ্যমে জেনে অনেকেই আমাকে ফোন করেছিলেন, সাহস যুগিয়েছেন, দোয়া করেছেন।
কঠিন ঐ সময়ে তার খোঁজ-খবর নেয়ার জন্য ডা: শাহনেওয়াজ চৌধুরী নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এমপি শামীম ওসমান, এমপি সেলিম ওসমান, মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী, ডিসি, সাংবাদিক মহল ও চিকিৎসকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। এছাড়াও তার আত্মীয়-স্বজন, বন্ধ-বান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশী, বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে যারা তার খোঁজ-খবর নিয়েছেন, সাহস যুগিয়েছেন, দোয়া করেছেন তাদের সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন তিনি।
সবশেষে তিনি বলেন, যখন প্রয়োজন তখনই যে কেউ আমাকে ফোন করবেন। আমি টেলিমেডিসিন সেবা দিয়ে যাচ্ছি। সবাই নিরাপদে থাকবেন, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখবেন, মাস্ক পড়বেন, নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন থাকবেন।
No posts found.